নুসরেত গোকচে যেভাবে হলেন সল্ট বে

পরিশ্রম আর একাগ্রতা থাকলে মানুষ যে অনেক দূর যেতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন সল্ট বে। জীবনের শুরুতে অবশ্য তিনি সল্ট বে নামে পরিচিত ছিলেন না। সল্ট বে হয়ে ওঠার জন্য তিনি পাড়ি দিয়েছেন বহু দূর। নুসরেত গোকচে ওরফে সল্ট বে আর্থিক অনটনের কারণে পড়ালেখা করতে পারেননি।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন তুরস্কের ইস্তাম্বুলের এক কসাইখানায়। শিক্ষানবিশ হিসেবে তিনি সেখানে কাজ শুরু করেন। কাজ শুরুর পর থেকেই তিনি মাংস কাটার কাজ খুব ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেন।

কসাইখানায় কাজ করার পাশাপাশি তিনি ঘুরে আসেন আর্জেন্টিনা আর যুক্তরাষ্ট্র। সময়টা ২০০৭ এবং ২০১০। রেস্তোরাঁর কাজ রপ্ত করার জন্য সেখানে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে শিখে ফেলেন রান্নার কলা-কৌশল।

এরপরই ২০১০ সালে ফিরে আসেন নিজ দেশ ইস্তাম্বুলে। শুরু করেন রেস্তোরাঁর ব্যবসা। মাত্র ৪ চার বছরের মধ্যে শাখা খোলেন পর্যটকদের কেন্দ্রবিন্দু দুবাইতে।

তখনও তিনি এতটা জনপ্রিয় ছিলেন না। তবে তাকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল মাত্র ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। ২০১৭ সালের ৭ জানুয়ারি ‘অটোমান স্টে’ শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন নুসরেত গোকচে।

নুসরেত গোকচের জন্ম তুরস্কের আনাতোলিয়ার ইরজুরেমের এক অসচ্ছ্বল কুর্দি পরিবারে। বাবা ছিলেন খনিশ্রমিক। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে ছেলেকে পড়াশোনা ছাড়িয়ে কসাইখানায় কাজে লাগিয়ে দেন বাবা। মাংস কাটাকাটির কলাকৌশল খুব ভালোভাবে রপ্ত করেন তিনি। নিজস্ব শৈলীতে মাংস কেটে ও গোখরা সাপের ভঙ্গিমায় মাংসের ওপর লবণ ছিটানোর ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে এক কোটি ভিউ হয়ে যায়। রাতারাতি ইন্টারনেট তারকা বনে যান তিনি।

এরপর তার দ্বিতীয় ভিডিও ভাইরাল হলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ইনস্টাগ্রামে তার বর্তমান ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। এত জনপ্রিয়তা তাকে এনে দিয়েছে আকাশচুম্বী ব্যবসায়িক সাফল্য। বেড়ে চলেছে তার রেস্তোরাঁর সংখ্যা। আবুধাবি ও দুবাইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে দোহা, আঙ্কারা, বদ্রুম, ইস্তাম্বুল, মারমারিস, জেদ্দা, গ্রিসের মিকোনাস এবং মিয়ামি, ক্যালিফোর্নিয়া, ডালাস, বেভারলি হিলস, নিউইয়র্ক ও লন্ডনে নুসরেতের স্টেকহাউস চেইন নুসার–এট শাখা ছড়িয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রেস্তোরাঁর শাখা খুলে কর্মীদের পাশাপাশি কাজ করেছেন নিজেও। তার এ ভিন্ন স্টাইলে মাংশ কাটায় মুগ্ধ হয়ে ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার, বেকহাম থেকে শুরু করে অস্কারজয়ী হলিউড তারকা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওরা তার রেস্তোরাঁর নিয়মিত অতিথি হয়েছেন।

তার রেস্তোরাঁয় একবেলা খাবার খেতে অনেক অর্থ খরচ হলেও তার শিল্পগুনে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই দামের বিষয়টি বিবেচনায় নেন না। তারা শুধুমাত্র সল্ট বের বিশেষ ভঙ্গিমা সচক্ষে দেখতে তার রেস্তোরাঁয় খেতে যান। একবার একজন নুসার-এট মিয়ামিতে এক বেলা খাবারের একটি বিল তার টুইটারে পোস্ট করেন, যার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২২৮ দশমিক শূন্য ৫ মার্কিন ডলার।

সল্ট বের এমন কর্মকাণ্ডকে অনেকে আবার নেতিবাচক হিসেবেও দেখছে। অনেকে সল্ট বের মাংসের ওপর ছুরি চালানো ও লবণ ছিটানোর ভঙ্গিমাকে অতিরঞ্জিত ও লোকদেখানো বলে মন্তব্য করেন।

যে যাই মন্তব্য করুক না কেন এতে কান দেওয়ার সময় নেই সল্ট বের। সল্ট বে জানান তিনি কোনো বিদেশি ভাষা জানেন না, তবে তিনি মাংসের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

ব্যক্তি জীবনে সল্ট বে অনেক দানশীল মানুষ। জনপ্রিয়তা কিংবা বিতর্কের বাইরে সল্ট বে ব্যক্তিগত জীবনে একজন চমৎকার মানুষ। তুর্কি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, এরজুরুমের প্যালালি গ্রামে তিনি প্রায় এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে চার হাজার বর্গমিটার আয়তনবিশিষ্ট মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। এ ছাড়া তিনি নিজ শহরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা কাজের মধ্যেই ডুবে থাকেন সল্ট বে। তারপরও তিনি পরিবারকে সময় দিতে ভুলেন না। এ নিয়ে তার মন্তব্য হলো, ‘যে পুরুষ তার পরিবারকে সময় দিতে পারে না, সে পুরুষ নামের কলঙ্ক।’

১৯৮৩ সালে তুরস্কে জন্মগ্রহণ করেন নুসরেত গোকচে। তারা বাবা ছিলেন একজন খনি শ্রমিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *